|
|
১২ রবিউল আউয়াল মহানবীর (সা.) ওফাতে শোক পালন করা প্রসঙ্গে।
------------------------------------------------------------------
� সুওয়াল : আমরা জেনেছি, ১২ রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের দিন হওয়া নিশ্চিত নয়। বরং কেউ কেউ ৮ রবিউল আউয়াল এবং কেউ ৯ রবিউল আউয়ালকে তাঁর জন্ম তারিখ বলেছেন। অপরদিকে ১২ রবিউল আউয়াল তাঁর ওফাতের দিন হওয়ার ব্যাপারে প্রায় সকলে একমত। তাই ১২ রবিউল আউয়ালে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করলে তার ওফাতের দিনে আনন্দ উদযাপন করা হয়—যা কোনক্রমেই উচিত নয়। তাই অনেকে এদিন তাঁর ওফাতের কারণে শোক পালনের ব্যাপারে মত প্রকাশ করছেন।
সেই হিসেবে ১২ রবিউল আউয়াল কি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের দিন হিসেবে শোকের দিন রূপে পালন করা যাবে? এ সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম কী?
▶▶ জাওয়াব : নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের দিন কুল কায়েনাতের জন্য আনন্দের দিন। কারণ, তিনি রাহমাতুল লিল আলামীন—সারা জাহানের জন্য রহমত। তেমনি নবীজীর (সাز) দুনিয়া থেকে বিদায়ের দিন বা ওফাতের দিন সারাবিশ্বের জন্য শোক ও বেদনার দিন। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের দিন বলে প্রকৃতপক্ষে কোন দিনকে বুঝায়। সেই দিন প্রথমে নির্দিষ্ট হওয়ার পর তাকে খুশীর দিন বা শোকের দিন হিসেবে সাব্যস্ত করার বিষয়টি আসবে।
মানুষ যখন মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়ায় ভূমিষ্ট হয়, তখনই সে জন্মগ্রহণ করে। মায়ের গর্ভ থেকে তার এ ভূমিষ্ট হওয়ার দিনই হচ্ছে তার জন্মদিন। তেমনি মানুষের রূহ যখন তার দেহ থেকে বিদায় হয়ে চলে যায়, তখন সে মৃত্যুবরণ করে। যেদিন তার রূহ তার দেহ থেকে বিদায় হয়ে চলে যায়, সেই দিনই হচ্ছে তার মৃত্যুদিবস। এ হিসেবে মানুষের জন্মদিন তার জীবনে একবারই আসে। মানুষের বারবার জন্ম হওয়া—এটা হিন্দুদের বিশ্বাস—যা পুনর্জন্ম নামে তারা বিশ্বাস করে, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তেমনি মানুষের মৃত্যুদিবসের আগমন জীবনে একবারই হয়—কারণ, একই ব্যক্তি বারবার মৃত্যুবরণ করে না।
অবশ্য কিছু কিছু বিষয় এমন আছে যেগুলো সমযের পরিক্রমার সাথে সম্পৃক্ত। সময়ের আবর্তনে তা বারবার আসে। যেমন, রামাজান, শবে ক্বদর, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা প্রভৃতি। এগুলো পৃথিবীতে শুধু একবারই আসে না, বরং বারবার—প্রতি বছর আসে। এ জন্য প্রতি বছর নতুন করে রামাজানের রোযা রাখতে হয়, প্রতি বছর শবে ক্বদরে ইবাদত করতে হয় এবং প্রতি বছর ঈদের দিন ঈদের নামায পড়তে হয় প্রভৃতি। তেমনিভাবে পাঁচওয়াক্ত নামাযের সময় জীবনে শুধু একবার আসে না, বরং প্রত্যেকদিন আসে। তাই প্রত্যেক দিন পাঁচওয়াক্ত নামায পড়তে হয়। কিন্তু মানুষের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন সময়ের পরিক্রমার সাথে সম্পৃক্ত নয়। তাই এগুলো বারবার বা প্রতি বছর আসে না। তা সংঘটিত হয় একটি মাত্র দিনে—যেদিন তার জন্ম হয়েছে বা যেদিন সে মৃত্যুবরণ করেছে। এরপর আর সে প্রতিবছর জন্মগ্রহণ করে না কিংবা মৃত্যুবরণ করে না। এ জন্য তার জন্মদিন বা মৃত্যুদিন প্রতি বছর আসার কোন সুযোগ নেই।
তবে প্রতি বছর তার জন্ম বা মৃত্যুর তারিখের মতো একটা তারিখ আসে। কিন্তু সেই তারিখকে তার জন্মদিন বা মৃত্যুদিন বলা ভুল। কেননা, সে তো সেই তারিখে জন্মগ্রহণ করেনি। যেমন, কেউ ২০১৩ সনের ৫ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে তার জন্মদিন হচ্ছে ৫/জানুয়ারী/২০১৩ ইং মুতাবিক ২২/রবিউল আউয়াল/১৪৩৪ হি. শনিবার। এতে পরের বছর ৫ জানুয়ারীকে তার জন্মদিন হিসেবে গণ্য করা যায় না। কেননা, সেদিন হচ্ছে ৫/জানুয়ারী/২০১৪ ইং মুতাবিক ৩/সফর/১৪৩৫ হি.—যার সাথে তার জন্মদিনের সনের এবং চান্দ্র ও সৌর উভয় তারিখের মিল নেই এবং বারও ঠিক নেই। আর যদি পরের বছরটিকে চান্দ্র তারিখ হিসেবে ধরা হয়, তখন একবছর পর তা হচ্ছে ২২/ রবিউল আউয়াল/১৪৩৫ মুতাবিক ২৪/জানুয়ারী/২০১৪ ইং শুক্রবার। এতেও তার জন্মসন পাওয়া যাচ্ছে না এবং সৌর তারিখটি ৫ জানুয়ারীর পরিবর্তে ২২ জানুয়ারী হয়ে যাচ্ছে। তেমনি বারও মিলছে না। অথচ তার জন্মদিন সাব্যস্ত হওয়ার জন্য তার জন্মগ্রহণের সবরকম তারিখ, মাস ও সন সবকিছু মিলতে হবে। কিন্তু সব মিলিয়ে তার জন্ম তারিখ কষ্মিনকালেও আসবে না। তাই কোনদিন তার জন্মদিনও ফিরে না আসা নিশ্চিত। তেমনি মৃত্যু তারিখেরও একই অবস্থা।
সুতরাং বুঝা গেলো—কোন মানুষের প্রতিবছর জন্মদিন বা মৃত্যুদিবস হতে পারে না। তাই এক্ষেত্রে প্রতিবছর সেই তারিখকে জন্মদিন বা মৃত্যুদিন বলা নিছক মিথ্যা দাবী—যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এ জন্য শরীয়ত একে বৈধতা দেয় না। আর বাস্তবেও তা সম্পূর্ণ ভূয়া ও কল্পনাপ্রসূত বিষয়।
অথচ সেই ভূয়া কালচারকেই ধারণ করে খৃষ্টানরা প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনের নামে তাদের কথিত খোদা যীশুর জন্মদিন পালন করেন এ বিশ্বাসে যে, যীশু তাদের খোদা এবং তিনি তাদের ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভূত হয়ে তাদের নিকট বিরাজমান আছেন। (নাউযুবিল্লাহ) আর এ রসমের উপর ভিত্তি করেই তারা নিজেদের মিথ্যা জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালনের অবাস্তব, ভিত্তিহীন ও অযৌ্ক্তিক কালচার সৃষ্টি করেছেন।
কিন্তু দুঃখজনক যে, অনেক মুসলমান এক্ষেত্রে খৃষ্টানদের সেই গর্হিত ও মিথ্যা কালচার দ্বারা ধোঁকা খেয়ে প্রতিবছর মানুষের জন্মদিন বা মৃত্যুদিবসের আগমনের অমূলক ও কল্পিত ধারণায় আক্রান্ত হয়েছেন। যদ্দরুণ তারা খৃষ্টানদের ন্যায় প্রতিবছর ভূয়া জন্মদিন এবং প্রয়াতদের ভূয়া মৃত্যুদিবস পালন করতে লেগেছেন।(নাউযুবিল্লাহ)
এ আলোচনার দ্বারা স্পষ্ট হলো যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিন হচ্ছে একমাত্র সেই দিনই যেদিন তিনি মা আমেনার গর্ভ থেকে পৃথিবীতে তাশরীফ এনেছেন। তা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শ’ বছর পূর্বের ৫৭০ বা ৫৭১ ঈসায়ী সনের ৮ বা ৯ কিংবা ১২ রবিউল আউয়াল মহান বরকতময় দিন। সেই দিনটি নিঃসন্দেহে সারা বিশ্ববাসীর জন্য অশেষ আনন্দের দিন। সেই দিনটিই সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য ফারহাতে মীলাদুন্নবীর দিন অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শুভ জন্মে খুশী-আনন্দে আপ্লুত হওয়ার দিন।
আর সেদিন নবীজীর শুভ জন্মে এই যে ফারহাতের শুভ সূচনা হয়েছে—তা শেষ হওয়ার নয়। তাইতো সর্বযুগেই মুমিনগণ সকলেই রাসূলুল্লাহ (সা.)কে নবী হিসেবে পেয়ে সর্বদাই খুশী ও আনন্দিত এবং তারা খুশী ও আনন্দিত থাকবেন কিয়ামত পর্যন্ত । তেমনি নবীজী (সা.)কে পাওয়ার অফুরন্ত আনন্দের ফল্গধারা মুমিনদের হৃদয়ে বিরাজিত থাকবে কিয়ামতের পর পরকালে অনন্তকাল যাবত—যার কোন পরিসীমা বা সমাপ্তি নেই।
তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত দিবস একমাত্র সেদিন—যেদিন তিনি সারাবিশ্বকে কাঁদিয়ে এ পৃথিবী ছেড়ে রাফীকে আ‘লার নিকট তাশরীফ নিয়ে গিয়েছেন। আর তা হলো আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর পূর্বের ১০ হিজরী সনের ১২ রবিউল আউয়াল-এর বেদনাময় দিন। সেদিন হযরত সাহাবায়ে কিরাম (রা.) নবীজীর (সা.) ওফাতে সীমাহীন বেদনায় মুষড়ে পড়েছিলেন। সেই দিনটি নিঃসন্দেহে বিশ্ববাসীর জন্য “হুযনে ওফাতুনন্নবী (সা.)”-এর দিন। এরপর থেকে বিশ্বের মুসলমানগণের হৃদয়ে সেই ব্যথার ক্ষরণ রয়ে গিয়েছে এবং তা বিরাজিত থাকবে কিয়ামত অবধি--যা পরকালে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্য পাওয়ার পরেই কেবল তিরোহিত হবে। তাই সেই পর্যন্ত কোন মুসলমান বলতে পারবে না যে, তার অন্তর রাসূলের বিরহে ব্যথিত নয়।
এভাবে মুমিনগণের অন্তর দিয়ে সর্বদাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দুনিয়ায় আগমনে খুশী ও সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর বিরহে হৃদব্যথা অনুভব করা ঈমানের দাবী। আর অন্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি নিজের বাবা-মা, সন্তান-সন্তুতি ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক মহব্বত পোষণ করা এবং এর বাস্তব প্রতিফলনে সার্বিক জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আাদর্শের অনুসারী হওয়া অপরিহার্য্ কর্তব্য।
কিন্তু এক্ষেত্রে প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিবস ও ওফাত দিবস আসার দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অবাস্তব চিন্তা। তাইতো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর চেহারা মুবারকে চুমু খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন—
بِأَبِي وَأُمِّي لا يَجْمَعُ اللَّهُ عَلَيْكَ مَوْتَتَيْنِ أَبَدًا لَقَدْ مِتَّ الْمُوتَةَ الَّتِي لا تَمُوتُ بَعْدَها
“আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক, নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে কখনো দু’বার মৃত্যু দিবেন না। আপনি সেই মৃত্যু বরণ করেছেন—এরপর আপনি আর মৃত্যুবরণ করবেন না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪১৮৭/ মুসনাদে তাবরানী, হাদীস নং ২৯৫৪)
তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.)কখনো কোন দিনকে উপলক্ষ করে তাঁর রওজা মুবারকে ঈদ পালন করতে নিষেধ করে ইরশাদ করেন—
لا تجعلوا قبري عيدا وفي رواية لا تتخذوا بيتي عيدا
“তোমরা আমার কবরকে ঈদ বানিও না।” অপর রিওয়ায়াতে রয়েছে—“তোমরা আমার ঘরকে ঈদ বানিও না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৪২/ সুনানে বাইহাকী, হাদীস নং ৪১৬২)
তাই প্রতি বছর ১২ রবিউল আউয়ালকে নবীজীর জন্মের দিন বানিয়ে ঈদে মীলাদুন্নবী পালনের যেমন অবকাশ নেই, তেমনি সেদিনকে তাঁর ওফাতের দিন স্থির করে হুযনে ওফাতুন্নবী বা নবীজীর ওফাতের শোক পালনের কোনরূপ বৈধতা নেই। এসবই নেকের সূরতে গর্হিত কাজ ও মারাত্মক বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।
অবশ্য মুমিনগণের বছরের প্রতিটি দিনই এবং সদা-সর্বদাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মে খুশী ও সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর ওফাতে হৃদব্যথা ধারণ করা কর্তব্য। তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি মহব্বতের পরিচায়ক—যা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
[হাওয়ালা : সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৮৪/ সুনান আবু দাউদ, হাদীস
নং ৩৯৯১/ জামি‘ তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৭৬ প্রভৃতি]
““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““
*** দ্বীনী এ পোস্টকে শেয়ার করে ইসলামের আলো পৌঁছে দিন প্রিয়জনদের কাছে। দ্বীনের হিদায়াতের সমূজ্জ্বল আলোকরশ্নিতে আলোকিত হোক মুমিনদের হৃদয়।
““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““““
>>> নিয়মিত এ “সুওয়াল-জাওয়াব :: মাসিক আদর্শ নারী” পেজের পোস্টসমূহের আপডেট পেতে এ পেজে লাইক দিন এবং বন্ধু-বান্ধবগণকে এর সহীহ দ্বীনী শিক্ষার আলো দেয়ার জন্য তাদেরকে এ পেজের দাওয়াত দিন। পেজটির লিঙ্ক --
Categories: None
The words you entered did not match the given text. Please try again.
Oops!
Oops, you forgot something.